প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসচক্রের সূত্রপাত ১৯৯৭ সালে। যার নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) তৎকালীন গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী। সিআইডির তদন্তে ওঠে এসেছে প্রায় তিন দশকের এক বিস্তৃত প্রশ্নফাঁসচক্রের চিত্র। তদন্ত বলছে, পরীক্ষার্থীদের আসন ব্যবস্থাপনা ও ডামি পরীক্ষার্থী সরবরাহের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সেই কার্যক্রম ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রশ্নফাঁসের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটে। ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং প্রশ্নপত্র কেনাবেচার তথ্য ওঠে এসেছে সিআইডির অভিযোগপত্রে।
২০২৪ সালের ৯ জুলাই প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করে সিআইডি। প্রায় দুই বছরের তদন্ত শেষে ১৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে ৫৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ জন বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়েছেন এবং ১৯ জন পলাতক রয়েছেন। আগামী ১৪ জুন আদালতে এ মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। সেদিন চার্জশিট আদালতে গৃহীত হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে বর্তমানে এ মামলায় আবেদ আলীসহ সব আসামি জামিনে রয়েছেন। কিন্তু দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন আবেদ আলী।
ডামি পরীক্ষার্থী থেকে প্রশ্নফাঁসের সাম্রাজ্য : তদন্তে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে পিএসসিতে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর আবেদ আলী কমিশনের তৎকালীন সদস্য মেছার মুজিবর রহমান বিশ্বাস ও মোজাম্মেল হকের গাড়িচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে তিনি পিএসসির অভ্যন্তরে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ পান এবং বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করেন। সে সময়ে প্রথম দিকে পরীক্ষার্থীদের একই কেন্দ্রে বা কাছাকাছি আসনে বসানোর ব্যবস্থা করে দিতেন তিনি। পরে ডামি পরীক্ষার্থী ব্যবহার করে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। একজন প্রকৃত পরীক্ষার্থীর সঙ্গে দুজন ডামি পরীক্ষার্থী যুক্ত করে পরীক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো।
তদন্তে বলা হয়েছে, নিয়োগের পর থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে এভাবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাইয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকা লেনদেন করেন আবেদ আলী।
প্রার্থী সংগ্রহের এজেন্ট, চাকরির নামে কোটি টাকার কারবার : পরবর্তীতে তার সঙ্গে পরিচয় হয় মাহফুজার রহমান কালুর। কালু চাকরিপ্রার্থীদের তালিকা সংগ্রহ করতেন এবং আবেদ আলী অর্থের বিনিময়ে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দিতেন। এ কাজে দুজনের মধ্যে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৫ সালে আতিকুল ইসলামের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব কর্মকর্তা পদে কয়েকজনকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার ঘটনায় আরও প্রায় ৩২ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এ সময়ের মধ্যে আবেদ আলী নিয়োগ পরীক্ষাকেন্দ্রিক একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
পরীক্ষার্থীদের ‘মেহমান’ নামে উল্লেখ করা হতো : তদন্তে ওঠে এসেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবেদ আলীর কর্মকাণ্ড ডামি পরীক্ষার্থী সরবরাহের পর্যায় পেরিয়ে সরাসরি প্রশ্নফাঁস পর্যন্ত গড়ায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পলিটেকনিক কলেজের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তিনি পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলামের কাছ থেকে পরীক্ষার দুদিন আগে প্রশ্ন সংগ্রহ করেন। পরে ৪০ জন পরীক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন সরবরাহ করা হয়। এ ঘটনায় প্রায় ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরীক্ষার্থীদের ‘মেহমান’ নামে উল্লেখ করা হতো। তাদের কোথায় রাখা হবে, কতজনের জন্য ব্যবস্থা করা যাবে, সে বিষয়ে চক্রের সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এক বার্তায় লেখা পাওয়া যায়, ‘ভাই দুই জায়গা ম্যানেজ করছি, ৪০/৪৫ জন রাখা যাবে।’ একইভাবে গত ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষায় ৪৪ জন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রশ্ন সরবরাহের জন্য অগ্রিম প্রায় ৪ কোটি টাকা নেওয়ার তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
তদন্তে বলা হয়েছে, পরীক্ষার দুদিন আগে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে তা নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। প্রশ্নপত্র সংগ্রহের বিনিময়ে সাজেদুল ইসলামকে ৭৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে পরীক্ষার্থীদের সাভারের একটি রিসোর্টে রেখে প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ বাণিজ্যের এ কার্যক্রমে একাধিক ব্যক্তি পরীক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতেন।
টাকা কই’, ‘লিস্ট পাঠাও’, ‘কাজ ১০০ ভাগ হবে’ : মামলার তদন্তে জব্দ করা মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণে প্রশ্নফাঁস চক্রের বিস্তৃত যোগাযোগ, পরীক্ষার্থীদের তালিকা, ব্যাংকে টাকা জমার রসিদ, চেকের ছবি এবং অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত অসংখ্য বার্তা পাওয়া গেছে। বার্তাগুলোতে পাওয়া গেছে, ‘টাকা কই’, ‘মেহমানদের লিস্ট পাঠাও’, ‘ভাইয়া যে কোনোভাবে একটু হওয়ানোর চেষ্টা করেন’, ‘কাজ ১০০ ভাগ হবে’-এ ধরনের কথোপকথন। তদন্ত সূত্র বলছে, এসব বার্তা নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ আর্থিক লেনদেন ও প্রশ্নফাঁসের কার্যক্রমের ইঙ্গিত।
১২ ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি টাকার সন্ধান : তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আবেদ আলীর নিজের ও তার প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১২টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্যও তদন্তকারীদের নজরে এসেছে, যার বৈধ উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ns coll