প্রকাশিত: অক্টোবর ৮, ২০২৬
ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেওয়া হয়েছিল বিধবা আছিয়া বেগমের (৪৩)। কয়েক দিন পর তাকে ডেকে নেওয়া হয় একটি দোকানে, সেখানে একটি কাগজে টিপসইও নেওয়া হয়। আছিয়ার ধারণা ছিল, সরকারি ফ্যামিলি কার্ডের জন্য এসব কাগজপত্র ও টিপসই নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু কিছুদিন পর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে ভিন্ন খবর—আছিয়ার নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। তাকে দেখানো হয় একটি কাবিননামা ও এফিডেভিট। সেখানে বর হিসেবে নাম রয়েছে তার পূর্ব পরিচিত আবদুল কুদ্দুছের। কাবিননামায় আছিয়ার টিপসই থাকলেও আছিয়ার দাবি—তিনি কোনো বিয়েতে যাননি, কাজি দেখেননি এবং বিয়েতে কোনো সম্মতিও দেননি।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের এই ঘটনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে তোলপাড় চলছে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে সালিশ বৈঠক করছেন।আছিয়ার অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে টিপসই নেন স্থানীয় জামায়াতকর্মী আবদুস ছাত্তার। সেই টিপসই ব্যবহার করেই জালিয়াতির মাধ্যমে তার নামে বিয়ের কাগজ তৈরি করা হয়েছে।
পাটুলি গ্রামের আছিয়া বেগমের বয়স ৪৩ বছর। প্রায় ১৩ বছর আগে তার স্বামী আবু কালাম মারা গেছেন। তিনি দুই ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন, তার নাতি-নাতনিও রয়েছে। তিনি জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর মানুষের জমিতে কাজ করে সন্তানদের বড় করেছেন। বিভিন্ন সময় বিয়ের প্রস্তাব এলেও তিনি আর বিয়ে করেননি।
আছিয়া বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে আবদুস ছাত্তার আমাকে ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলেন। বিশ্বাস করে আমি জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি দিই। পরে টিপসই দেওয়ার জন্য আমাকে আবার ডেকে নেওয়া হয়। আমি স্বাক্ষর করতে পারি না, তাই কাগজে টিপসই দিই। এরপরই জানতে পারি, ওই টিপসই দিয়ে আমার নামে কাবিননামা তৈরি হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই নিয়ে এখন বলছে আমার নাকি বিয়ে হয়ে গেছে! আমি কোথাও বিয়ে করতে যাইনি, কাজীও দেখিনি।অন্যদিকে, যে নারীর সাথে বিয়ের প্রচার চালানো হচ্ছে, সেই আবদুল কুদ্দুসের বাড়ি পাটুলী বাজারের পাশেই। তার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। স্ত্রী সুফিয়া খাতুন, এক ছেলে, এক মেয়ে ও নাতি-নাতনি নিয়ে আবদুল কুদ্দুসের সংসার। স্বামী বাড়িতে নেই দাবি করে সুফিয়া খাতুন বলেন, বিয়ের বিষয়ে আমার স্বামী আমাকে আগে কখনো কিছু জানাননি। ঘটনার পর বিষয়টির জানাজানি হলে তিনি দাবি করেন যে, কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে তিনি বিয়ে করেছেন। আমরা তাকে বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তিনি কারো কথা শোনেননি।
ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় দেখা যায়, পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি গোলাম মোস্তফা বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। এতে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেনমোহর এবং ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে আবদুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামের নাম রয়েছে। তবে সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি কোনো কাবিনের সাক্ষী হননি এবং তিনি এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।কাবিন সংক্রান্ত বিষয়ে কাজি গোলাম মোস্তফা বলেন, আমি এই বিয়ে সম্পন্ন করিনি। যে কাগজ ছড়িয়েছে সেটি সম্পূর্ণ জাল। সে বিষয়ে পুলিশের সাথে কথা বলব।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আছিয়ার সঙ্গে আবদুল কুদ্দুছের পরিচয় আগে থেকেই। আছিয়ার ছেলের বিয়ের সময় কুদ্দুছকে উকিল শ্বশুর করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময় কুদ্দুছের পক্ষ থেকে আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও আছিয়া প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করেন। স্বামী মারা মারা যাওয়ার পর কদ্দুছ ছাড়াও অনেকে বিয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানদের জন্য বিয়েতে রাজীন হয়নি। মানুসে জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সন্তানদের বড় করছেন আছিয়া।
এ ঘটনায় এলাকায় সালিশের নেতৃত্ব দেওয়া স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ রুস্তম আলী বলেন, আছিয়ার কাছে কাবিনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে তার টিপসই নেওয়া হয়েছিল। কাবিননামায় থাকা সাক্ষীরাও সালিশে জানিয়েছেন যে তারা বিয়ের বিষয়ে কিছুই জানেন না। কিন্তু কীভাবে কি হলো আমরা যাচাই করছি। সালিশের মাধ্যমে সমাধান না হলে আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুটিজানা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করা এবং নিজেকে জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া আবদুস ছাত্তার পাটুলি বাজারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী। তিনি ফ্যামিলি কার্ডের নামে টিপসই নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, আমি ওই মহিলার কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে কোনো টিপসই নেইনি। অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক শামীম বলেন, ঘটনাটি জানার পর আমরা স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়েছি। তিনি (আবদুস ছাত্তার) জামায়াতের নিয়মিত পদধারী কোনো নেতা নন; নির্বাচনের সময় একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন এবং পূর্বে বিএনপি করতেন। তিনি এ ঘটনার সাথে জড়িত নন বলেই আমাদের ধারণা। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি এবং আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুযায়ী বিচার হোক। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।গত সোমবার ও বুধবার পাটুলী গ্রামে এ নিয়ে সালিশ বসলেও সেখানে অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুস উপস্থিত ছিলেন না। পরে সালিশে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। সালিশের নেতৃত্বে দেওয়া এর মধ্যে আবদুস ছাত্তার তার অবস্থান স্পষ্ট না করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান সালিশে নেতৃত্বে দেওয়া মোহাম্মদ রুস্তম আলী।
ফুলবাড়ীয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান বলেন, ‘ঘটনাটি আমরা বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনেছি। তবে থানায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের বিষয় ব্যবহার করে কেউ প্রতারণা করে থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ns coll