মুজিবের ছবিযুক্ত টাকা ফের বাজারে ছাড়ার ঘোষণায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নেটিজেনরা

প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংবলিত পুরোনো নোটগুলো পুনরায় বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অন্তর্বর্তী সরকার জন আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যে নোটগুলো সিলগালা করে নতুন ডিজাইনের প্রচলন করেছিল, ‘সাশ্রয়ের’ অজুহাতে সেগুলোই এখন জনসাধারণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। নেটিজেনদের মতে, এটি জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সাথে এক চরম উপহাস।

৫ আগস্টের পতনের পর দেশজুড়ে শেখ মুজিবের মূর্তি ও ছবি ভাঙচুর করে ডাস্টবিনে নিক্ষেপের মাধ্যমে যে গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেই স্মৃতি এখনো জনমনে টাটকা। বিক্ষুব্ধ মানুষ চরম ঘৃণা থেকে যে ব্যক্তির ছবি ও মূর্তি অপসারণ করেছিল, সেই একই ছবি এখন পুনরায় সাধারণ মানুষের পকেটে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘হঠকারী’ বলছেন ছাত্র-জনতা। আন্দোলনকারীরা সতর্ক করেছেন যে, সাময়িক অর্থনৈতিক সংকট তারা মেনে নিতে প্রস্তুত, কিন্তু কোনোভাবেই একজন ‘ফ্যাসিস্টের’ ছবি পুনরায় গ্রহণ করবেন না। অতি সত্বর তারা সরকারকে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। নতুবা আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, জুলাই অভ্যুথানের মুখে গতহত্যাকারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে শেখ মুজিবের মূর্তিগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। কোথাও কোথাও জনরোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে শেখের মূর্তির মাথার উপর মলমূত্র ত্যাগের ঘটনাও ঘটে। পরে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগের ‘প্রতীকবাদ’ ও ‘ফ্যাসিবাদী চিহ্ন’ মুছে ফেলার অংশ হিসেবে শেখ মুজিবের ছবিযুক্ত নোট ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছিল। সে সময় নতুন ডিজাইনের নোট বাজারে আনা হয়।

তবে বর্তমান সরকার ‘অর্থ অপচয় রোধের’ অজুহাতে আগের ছাপানো এবং সিলগালা করে রাখা কয়েক হাজার কোটি টাকার নোট বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নতুন ডিজাইনের নোটের সরবরাহ কম থাকায় এবং পুরোনো নোটগুলো নিষিদ্ধ না হওয়ায় ঘাটতি মেটাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিরা ‘শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানি’ ও উপহাস হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এমন জনধিকৃত ব্যক্তির ছবিযুক্ত টাকা পুনরায় ছাড়ার সিদ্ধান্তকে বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি ‘ভেতরের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, যেখানে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে কোনো সরকারি দপ্তর ও মুদ্রায় নিজের বা পরিবারের ছবি টাঙানোর ও যুক্ত করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সেখানে জনগণের চরম ঘৃণা ও ক্ষোভের কেন্দ্রে থাকা শেখ মুজিবের ছবি পুনরায় মুদ্রায় ফিরিয়ে আনা সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করবে।

সমালোচকদের মতে, বিএনপি’র ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে এই জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলটির ভেতরে কিছু অজনপ্রিয় বয়োজৈষ্ঠ নেতা জনগণের সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে গিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খুশি করতে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করেন কেউ কেউ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা পর্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তাদের মতে, ৫ আগস্টে যে ব্যক্তির ছবি-মূর্তি ভেঙে চুরমার করে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করা হয়েছে, তার ছবি পকেটে নিয়ে ঘোরা জনগণের জন্য চরম অপমানজনক।

বিক্ষুব্ধ নেটিজেনদের দাবি, অতি দ্রুত এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায়, তারা পুনরায় রাস্তায় নামতে বাধ্য হবেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের মতে, যে প্রতীকবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে কয়েক হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, সেই প্রতীককে অর্থ অপচয়ের অজুহাতে ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আহমেদ রাজিব লিখেছেন, “হাজার হাজার ভাই রক্ত দিয়ে দেশ পুনরায় স্বাধীন করলো এই ফ্যাসিস্টের চিহ্ন মুছে দিতে। এখন অপচয় রোধের দোহাই দিয়ে সেই ঘৃণিত চেহারা আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? আমরা সাময়িক অর্থনৈতিক সংকট মেনে নেব, কিন্তু এই অপমান নয়। দ্রুত এই সিদ্ধান্ত বাতিল করুন।”

ব্যবসায়ী সালাম চৌধুরী লিখেছেন, “৫ আগস্টের পর মানুষ যখন মুজিবের মূর্তির ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছিল, তখন সরকার কি জনগণের পালস বোঝেনি? এই টাকা বাজারে ছাড়া মানে গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করা। এটি সরকারের জনপ্রিয়তাকে নস্যাৎ করার একটি পরিকল্পিত চাল। তারেক রহমান সাহেব নিজে তো কোনো ছবি টাঙাচ্ছেন না, তবে তার প্রশাসনের ভেতরে কারা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? অন্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, আর শুধু টাকা ছাপানোর বেলায় অপচয়ের দোহাই? আমরা এই নোট বর্জন করব।”
Ns coll

  • শেয়ার করুন