বিরল নয়, দেশে বিভিন্ন খামারে পালন হচ্ছে অ্যালবিনো মহিষ

প্রকাশিত: মে ২৯, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

কোরবানির ঈদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজধানীর পশুর হাট এবং জাতীয় চিড়িয়াখানাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি অ্যালবিনো মহিষ। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে লালন-পালন করা এই মহিষটির মাথার চুলের বিশেষ বিন্যাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের আদলের সঙ্গে মিল থাকায় খামারিরা মজার ছলে এর নাম দেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। এরপর থেকেই মহিষটি ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও স্থান পায়।

ঈদের আগে মে মাসজুড়ে খামারটি দেখতে নারায়ণগঞ্জে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। কেউ ছবি তুলতে, কেউ ভিডিও করতে আবার কেউ কৌতূহল মেটাতে যান মহিষটি দেখতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এটি ‘সেলিব্রিটি মহিষে’ পরিণত হয়।

তবে এই মহিষকে ঘিরে যতটা আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার চেয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে এটিকে ‘অত্যন্ত বিরল’ হিসেবে উপস্থাপন করা নিয়ে। প্রাণিসম্পদ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এটিকে ‘অত্যন্ত বিরল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও অ্যালবিনো বা গোলাপি রঙের মহিষ বাংলাদেশে নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারে দীর্ঘদিন ধরেই এমন মহিষ পালন করা হচ্ছে। ফলে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ব্যতিক্রমী চেহারার হলেও এটি অজানা কোনো প্রাণী নয়।খামার সূত্রে জানা যায়, মহিষটির নামকরণ মূলত পারিবারিক মজার একটি ঘটনা থেকে আসে। পরে সেটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের আগে মহিষটি বিক্রি করা হয় কেরানীগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে। পরে সেটিকে ঘিরে ব্যাপক আয়োজনও করা হয়, যা সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত মহিষটি কোরবানি না হয়ে ঢাকার মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থান পায়।

ঈদের দিন চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি বিশেষভাবে সংরক্ষণের জন্য আনা হয়নি, তবে বড় শেডে রাখায় দর্শনার্থীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

এদিকে প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানান, অ্যালবিনো মহিষটি বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মহিষে মাত্র একটি এমন অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নিতে পারে। এ কারণেই মহিষটিকে সংরক্ষণের জন্য জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, মহিষটির জন্য বিশেষ শেড প্রস্তুত করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকেও অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং গবেষকরা বলছেন, অ্যালবিনো মহিষকে পুরোপুরি ‘বিরল’ হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন খামারে দীর্ঘদিন ধরেই অ্যালবিনো বা গোলাপি মহিষ পালন করা হচ্ছে। বিশেষ করে সাভার, উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় এমন মহিষ পাওয়া যায়।

তাদের মতে, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ আলোচনায় এসেছে মূলত এর চুলের ধরন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এবং গণমাধ্যমের প্রচারের কারণে।

সাভারের আশুলিয়ায় কাইয়ুম অ্যাগ্রো খামারে বর্তমানে অর্ধশতাধিক অ্যালবিনো মহিষ রয়েছে। খামার মালিকের মতে, এসব মহিষ কৌতূহল তৈরি করলেও বাণিজ্যিকভাবেও এগুলো লাভজনক। তিনি জানান, মানুষ প্রথমে এগুলো দেখতে এলেও পরে অনেকেই কিনে নেয়। গোলাপি মহিষের মাংসও তুলনামূলক নরম ও সুস্বাদু।অন্যান্য খামারিরাও বলছেন, মহিষ পালন এখন গরুর তুলনায় সহজ ও কম ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি মহিষের মাংসে প্রোটিন বেশি এবং চর্বি কম থাকায় এর চাহিদা বাড়ছে শহরাঞ্চলেও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালবিনো কোনো আলাদা প্রজাতি নয়। এটি মূলত একটি জেনেটিক বৈশিষ্ট্য। প্রাণীর শরীরে মেলানিন নামের রঞ্জক পদার্থ কম থাকলে ত্বক, চোখ ও লোমে সাদা বা গোলাপি আভা দেখা যায়। সেই কারণেই এসব মহিষের গায়ের রঙ গোলাপি বা হালকা সাদা দেখায়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য দেশে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার মহিষ প্রস্তুত ছিল। যদিও সংখ্যায় গরু ও ছাগলের তুলনায় কম, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মহিষের বাজার ও চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক তথ্যভিত্তিক প্রচার ও উপস্থাপনা হলে ভবিষ্যতে মহিষ পালন শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ns coll

  • শেয়ার করুন