প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৬
বাবা আর নেই এই নির্মম সত্যটিও জানতেন না ঋতু খাতুন। বাবার মৃত্যুর খবর গোপন রেখেই তাকে পাঠানো হয়েছিল পরীক্ষার কেন্দ্রে। পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফেরার পর জানতে পারেন জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়টিই আর নেই। বুকভরা শোক নিয়েই পরের পরীক্ষাগুলোতে বসতে হয়েছে তাকে।
সেই অসহনীয় কষ্ট বুকে নিয়েই এসএসসির বাকি পরীক্ষা শেষ করেন ঋতু। ফল প্রকাশের পর দেখা গেল মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী।
ঋতু খাতুন চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গ্রামের মৃত কবির হোসেন ও রেহেনা খাতুন দম্পতির ছোট মেয়ে। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন দিনমজুর বাবা কবির হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন।
পরিবার ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অসুস্থ বাবাকে বাড়িতে রেখেই ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ঋতু। পরীক্ষার মধ্যে বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।গত ১০ মে ছিল ঋতুর বাংলাদেশ ও বিশ্বসভ্যতা পরীক্ষা। সেদিন ভোররাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কবির হোসেন। সকালে তার মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলেও ঋতুকে বাবার মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। পরীক্ষা শুরুর আগে বাবাকে হারানোর খবর জানলে মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে—এই আশঙ্কাতেই পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি গোপন রাখেন।
হাকিমপুর গ্রামের বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের চৌগাছা শহরের ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে যায় ঋতু। সে পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পরই বাবার মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয়। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে ঋতু জানতে পারে তার বাবা আর বেঁচে নেই।
একদিকে বাবাকে হারানোর শোক, অন্যদিকে সামনে আরও পরীক্ষা। সেই শোক বুকের মধ্যে চেপেই পরীক্ষার বাকি দিনগুলোতে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে তাকে। বাবার শেষ মুখটিও দেখতে হয়েছে পরীক্ষার ফাঁকে।ফল প্রকাশের পর ঋতু খাতুন বলেন, বাবা বেঁচে থাকলে আমার এই ফল দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই। বাবা নেই এখন আমার উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।
হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শাহানা খাতুন বলেন, ঋতু অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। অসুস্থ বাবা, পরিবারের আর্থিক সংকট এবং বাবাকে হারানোর মতো কঠিন পরিস্থিতিও তার মেধা ও মনোবলকে দমাতে পারেনি। শিক্ষকরা তার ভালো ফলের প্রত্যাশা করেছিলেন। ভবিষ্যতেও ঋতু সাফল্যের স্বাক্ষর রাখবে বলে আশা করেন তিনি।
ঋতুর উচ্চশিক্ষার পথ সহজ করতে সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান এই শিক্ষক। তার মতে, ঋতুর জন্য একটি শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা গেলে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে তা বড় সহায়তা হবে।চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, এটি অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ঋতুর এমন ফল সত্যিই প্রশংসনীয়। উপজেলা প্রশাসন এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে। তিনি ঋতুর উচ্চশিক্ষার বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
ns coll