নেত্রকোনায় পাহাড়ি ঢলে ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি: জেলা প্রশাসনের তথ্য

প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলসহ ১০ উপজেলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক হিসাবে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক জরিপে অন্তত ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষকের ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন।

স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাবে জেলার কলমাকান্দায় ১৪ হাজার ৬৭৫টি পরিবারের ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর, খালিয়াজুরীতে ১৫ হাজার ১৩৩টি পরিবারের ৬ হাজার ২শ হেক্টর, মদনে ৮ হাজার ৪৭০টি পরিবারের ৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর, সদরের ৩ হাজার ৯৬৫টি পরিবারের ৪৯৫ হেক্টর, বারহাট্টায় ৩ হাজার ৩৬৫টি পরিবারের ৫৮২ হেক্টর, কেন্দুয়ায় ৯ হাজার ৩৪০ পরিবারের ১ হাজার ৩১০ হেক্টর, আটপাড়ায় ৭ হাজার ৫৫০ পরিবারের ১ হাজার ৬শ হেক্টর, মোহনগঞ্জে ৩ হাজার ৫শ পরিবারের ৪৩৪.৫ হেক্টর, পূর্বধলায় ১ হাজার ২৫০ পরিবারের ৩শ হেক্টর ও দুর্গাপুরে ২ হাজার ৪৫০ পরিবারের ৩২৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩১৩ কোটি টাকা।

তবে স্থানীয়রা জানিয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ এর কয়েকগুণ বেশি। প্রকৃত তথ্য কৃষি বিভাগের জরিপে উঠে আসেনি।

পাউবোর সূত্রে জানা গেছে নেত্রকোনায় এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ১৩৮ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধের ওপর কৃষকদের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নির্ভর করে। সেখান থেকে ধান উৎপাদন হয় প্রায় ৩ লাখ টন। এই ধানের ওপরই হাওরের কৃষকদের সন্তানদের লেখাপড়াসহ সারা বছরের সংসার খরচ নির্ভর করে। তাই ফসল হারানোর আশঙ্কা মানেই তাদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। এবার অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে জেলার ছোট-বড় সব নদ-নদীর পানি বাড়লেও কোনো বেড়িবাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটেনি। সব পানিই বৃষ্টির জমাটবদ্ধ।

জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওড়াঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়। সরকারি হিসেবে হাওড়ে ৬২ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়েছে। আর অতিবৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতি হয়েছে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ধান।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাস্তব চিত্রটা আরও ভিন্ন। টানা কয়েক দিনে খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, আটপাড়া ও বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন হাওর ও বিলে ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওড়াঞ্চলে ফসল এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ খেতের ধান কাটা বাকি। আর হাওড়ে পানিতে নিমজ্জিত আছে প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার হেক্টর খেতের ধান।কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন হাওড়ে পানি আসবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এবার ভারতের চেরাপুঞ্জি, আসাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ায় এই পানি এসেছে। অবশ্য ঢলের কোনো পানি হাওরের ভেতরে আসতে পারেনি। এবার ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকেরা হার্ভেস্টার দিয়ে সহজে ধান কটতে পারেননি। অন্যান্য বছর কৃষকেরা কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, পাবনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধান কাটার শ্রমিক আনতেন। তারা হাওড়ে জিরাতি হয়ে ধান কাটতেন। কিন্তু হার্ভেস্টারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এখন শ্রমিক আনা হয় না। আর খেতে পানি জমলে ধানকাটার যন্ত্রটি ব্যবহার করা যায় না। এছাড়া শুকনো মৌসুমে হাওড় থেকে পানি দেরিতে নামায় কৃষকদের বীজতলা প্রস্তুত করতে দেরি হয়। তাই ধানের চারাও দেরিতে লাগানো হয়।

হাওড়ে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি যেতে পারছে না। পানি যাওয়ার পথগুলো পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে। হাওড়ের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজো হয়ে রয়েছে।

অবশ্য খালিয়াজুরি কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের দাবি, উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। গতকাল শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৫২ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়েছে। প্রায় সব খেতের ধান পানির নিচে।

জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন রোববার দুপুরে জানান, কংস ও উব্দাখালি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে আছে। আর ধনু নদের পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ns coll

  • শেয়ার করুন