অগ্রণী ব্যাংকের ভল্ট থেকে ৪ কোটি টাকা সরিয়ে খামারে বিনিয়োগ, ক্যাশ ইনচার্জসহ গ্রেপ্তার ২

প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

একটি লোন পেতে গ্রাহককে ব্যাংক ম্যানেজারের পিছে দৌড়াতে গিয়ে ক্ষয় হয়ে যায় জুতার তলা। তার ওপর এই কাগজ-সেই কাগজ দিতে দিতে গলদঘর্ম হতে হয়। তবুও লোন পাওয়া যাবে কিনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারবেন কিনা- সেই নিশ্চয়তা থাকে না।

তবে চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেনকে এসবের কিছুই করতে হয়নি। গ্রাহকের টাকা সরাসরি ভল্ট থেকে নিজ হাতে তুলে নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন একটি অ্যাগ্রোফার্ম তথা গরুর খামারে। হাজার বা লাখ টাকা নয়। ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সরিয়ে নিয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রামের লালদীঘিপাড় জেলা পরিষদ ভবনের দ্বিতীয়তলায় অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি লিমিটেডের করপোরেট শাখায় এ ঘটনা ঘটে। অগত্যা ক্যাশ মেলাতে গিয়ে ভল্টে বিপুল পরিমাণ টাকার এই ক্যাশ ঘাটতি ধরা পড়ে।

শেষপর্যন্ত ব্যাংক ম্যানেজার বাদী হয়ে মামলা করেন ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন (৪১) ও তার এক সহযোগী জাফরুল্লাহ তানভীরের (২৫) বিরুদ্ধে। তাদের তুলে দেওয়া হয়েছে পুলিশের হাতে।

বুধবার রাতে মামলা দায়েরের পর তাদের গ্রেপ্তার করে পাঠানো হয় জেলহাজতে। মামলায় আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

কোতোয়ালি থানার ওসি আবু জায়েদ মো. নাজমুন নুর গণমাধ্যমকে বলেন, অগ্রণী ব্যাংকের ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা গায়েবের ঘটনায় ব্যাংক ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেছেন। ইতোমধ্যে আমরা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছি। আদালত তাদের কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার এজাহার ও ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কামরুল হোসেন ওই শাখার ক্যাশ ও ভোল্টের দায়িত্বে ছিলেন। ৯ আগস্ট নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেন শেষে নগদ অর্থের হিসাব এবং ভোল্টে সংরক্ষিত নগদ অর্থের হিসাব মেলানোর সময় ঘাটতির বিষয়টি ধরা পড়ে। কাগজে-কলমে যে টাকা থাকার কথা ভোল্টের টাকা গণনা করে দেখা গেছে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা কম। এ অবস্থায় কামরুল হোসেনের কাছে ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারছিলেন না। ভল্টের টাকা গুনতে গিয়ে ধরা পড়ে কারসাজির চিত্র।

দেখা গেছে, ভল্টে থাকা এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিলের ভেতর বেশিরভাগই একশ টাকার নোট। এতে বাইরে থেকে এক হাজার টাকার নোট ধরে বান্ডিল গণনা করে হিসাব মিলানো হলেও বাস্তবে টাকা ছিল কম। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বের হয়ে আসে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ক্যাশ ইনচার্জ বলেছেন, ব্যাংক থেকে সরানো সেই টাকা তিনি জাফরুল্লাহ তানভীর নামে তার এক সহযোগীর মাধ্যমে একটি অ্যাগ্রোফার্মে বিনিয়োগ করেছেন। হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত অ্যাগ্রো’ নামে ওই গরুর ফার্মে বর্তমানে বিভিন্ন উন্নত জাতের ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে।’

সূত্র জানায়, ১ জুন ২০২৫ থেকে ৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হয়। একটি ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন শেষ হওয়ার পর প্রতিদিন ক্যাশ ও ভল্টের হিসাব মেলানোর নিয়ম রয়েছে; কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন যে ঘাটতি শুরু হয় তা এতদিন ধরা পড়ল না কেন সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার ম্যানেজারসহ অন্য কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন কিনা সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে এ ঘটনায় যদি আরও কেউ জড়িত থাকেন বা কারও দায় থাকে তা তদন্তে বের হয়ে আসবে বলে সূত্র জানায়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার জাফরুল্লাহ তানভীরের বাবা আজিম উল্লাহ দাবি করেছেন, তার ছেলে এ ঘটনায় জড়িত নয়। তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে।

ভল্ট থেকে টাকা গায়েবের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেনকে। তিনি বলেছেন, মামলার এজাহারভুক্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে একটি আইফোনসহ দুইটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। তারা কিভাবে টাকাটা সরালেন, কাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল, এসব ঘটনার সঙ্গে আর কার কার দায় থাকতে পারে সেসব বিষয় তদন্তে বের হয়ে আসবে।
ns coll

  • শেয়ার করুন