খুলনায় চুরির অভিযোগে মধ্যরাতে শিক্ষার্থীকে মারধর, হাসপাতালে মৃত্যু

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) হলরোড সংলগ্ন ইসলামনগর সড়কে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করার পরে হাসপাতালে নিহতের ঘটনা ঘটেছে। নিহত মো: আজমুল হোসেন (২২) নগরীর নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাসা চুয়াডাঙ্গার দর্শনায়।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত ১২ টার দিকে ওই সড়কের একটি ৪ তলা ভবনের ছাদে চুরির অভিযোগে মারধর ও চুল কেটে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে খুবির এম্বুলেন্সে করে আহত আজমুলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১টা ৩০ মিনিটের দিকে কয়েকজন যুবক গুরুতর আহত অবস্থায় আজমুলকে খুমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে নেওয়ার সময় তারা কর্তৃপক্ষকে জানান, আজমল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটি ভবনের চারতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা খুবির সাবেক এক শিক্ষার্থী বলেন, ওই ছাত্রকে (আজমল হোসেন) খাবারসহ বিভিন্ন জিনিস চুরির অভিযোগে ধরা হয়। এরপর তার কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য বের হচ্ছিল। সে রুম থেকে গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, জুতা এবং টাকা নেওয়ার কথাও স্বীকার করেছিল।

তিনি বলেন, প্রথমে লাউডস্পিকারে ওই ছাত্রকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়। তখন সে তার বাবাকে জানায় যে, সে সেখানে থাকে এবং টাকা ও অন্যান্য জিনিস চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তার বাবা তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন সে এসবের মধ্যে গেছে। এরপর ফোনটি রিফাতের কাছে দেওয়া হয়। তিনি ওই ছাত্রের বাবাকে বলেন, ‘আপনার ছেলে এই কাজ করছে, আপনার তো আসা উচিত। আপনি কালকে আসেন, এসে একটা ব্যবস্থা করেন। এখানে তো আর রাখা যাবে না।’ এরপর ফোনটি অন্য এক-দুইজনের হাতেও চলে যায়। চারদিকে তখন অনেক লোকজন, আওয়াজ ও বিশৃঙ্খলা থাকায় পরে কে ফোনে কথা বলেছে, তা তিনি খেয়াল করেননি।

ওই মেসের একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরুতে সেখানে ১০-১২ জনের মতো শিক্ষার্থী ছিল। পরে আরও অনেক লোকজন চলে আসে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই সময় তাকে চড়-থাপ্পড় ও মারধর করা হয় এবং তার চুল কেটে দেওয়া হয়। পরে আরও লোকজন চলে আসায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং টুকটাক বাড়াবাড়িও হয় বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

ছাদে থাকাবস্থায় তার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ওই মেসের শিক্ষার্থীরা। কথা বলার পর আবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। তখন সে হঠাৎ ছাদের যে কর্নার বা কার্নিশের দিকে সে যায়, সেখানে বৃষ্টির পানি জমে জায়গাটি কিছুটা পিচ্ছিল ছিল। সে সেখানে গিয়ে সরাসরি লাফ দেয়। তাদের তাকে ধরার কোনো সুযোগ ছিল না।

এদিকে মারধর শেষে নিহত আজমলের পিতার কাছে ফোন দিয়ে চুরির ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ লক্ষ টাকা দাবি করেন বলে পরিবার সূত্রে জানা যায়৷

নিহত ওই ছাত্রের বাবা কুতুবউদ্দিন দাবি করেন, রাতে আমাকে কল দিয়ে জানায় এখানে একটা ঘটনা ঘটেছে খরচ । পরে ফোনেই ১ লক্ষ টাকা চাওয়া হয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে। পরে আমি বলি ঠিক আছে তোমাদেে আন্ডারে রাখো। পরে আমি ফোনের উপরে ফোন দেই কিন্তু ফোন ধরেনা, পরে ফোন অফ পাই। সকালে ট্রেনে করে খুলনায় এসে সকালে পৌছায় ৬টার পরে সেখানে যাওয়ার পরে কয়েকজন বলে চাচা আপনার ছেলেরে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বলে আপনার ছেলে ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে। মেসের ওরা বললো চাচা আপনার ছেলে ২৫০ বেড হসপিটালে আছে।

তিনি দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, তারপরে দেখলাম অতিরিক্ত ওরা মারধর করে মেরে ফেলছে৷ আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম আমি চাচ্ছিনা কোটকাচারি করবো, বিচার করবেন তিনি। আমার কোনো অভিযোগ নাই, আমি চাচ্ছিনা আমার ছেলেরে কাটাকুটি করুক।

টাকা-পয়সা দাবি করার বিষয় অস্বীকার করে ঘটনাস্থলে থাকা এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, তিনি এ ধরনের কোনো কথা শুনেননি। তার মতে, তাদের কেউ টাকা-পয়সা দাবি করার মতো কথা বলবে এটা অসম্ভব। তিনি জানান, ওই সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং পরিকল্পনা ছিল ছাত্রটিকে সেখান থেকে নিয়ে পুলিশে দিয়ে দেওয়া।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় ছাদে ১৫-২০ জনের মতো মানুষ ছিলেন। ছাত্রটি লাফ দেওয়ার পর সবাই হতবিহ্বল হয়ে যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের কোনো মানুষ, সে যত খারাপই হোক, কাউকে ছাদ থেকে ফেলে মেরে ফেলার মতো মানসিকতা রাখবে এটা তিনি বিশ্বাস করেন না। তিনি ফেসবুকে এ ধরনের আলোচনা দেখতে পেয়ে বিষয়টিকে দুঃখজনক বলেও উল্লেখ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে একটি ভবনের চতুর্থ তলার ছাদে আজমলকে কয়েকজন মারধর করেন। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় নিচে পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তবে কী কারণে তাকে মারধর করা হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় দেয়া কয়েকজন যুবক গুরুতর আহত অবস্থায় আজমলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হাসপাতালে নেয়ার ১০-১৫ মিনিট পর তার মৃত্যু হয়। এ সময় সঙ্গে থাকা যুবকেরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটি ভবনের চতুর্থ তলা থেকে চুরি করে পালানোর সময় লাফিয়ে পড়ে আজমল আহত হয়েছেন।

হাসপাতাল সূত্রের ভাষ্য, আজমলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার মাথার চুলও এক পাশ দিয়ে কাটা ছিল। মৃত্যুর পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা যুবকেরা দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়েন।

স্থানীয় কয়েকজন বাড়ির মালিক জানান, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার দিকে পাশের একটি ভবন থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে তারা বাইরে আসেন। এ সময় ভবনের চতুর্থ তলায় একজনকে মারধর করতে দেখা যায়। পরে ওই ব্যক্তিকে নিচে পড়ে থাকতে দেখেন কয়েকজন এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থী।
ns coll

  • শেয়ার করুন