প্রকাশিত: অক্টোবর ৬, ২০২৬
ফেসবুকে ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে সৌদি আরবে ২৪ বছর বয়সি এক শ্রীলঙ্কান অভিবাসী শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনোজান শিবারাসা নামের ওই যুবকের পরিবারের সঙ্গে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। তার জীবন রক্ষায় সৌদি সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আবেদন জানিয়েছে তার পরিবার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আনোজানের মা রাসামানিক্কাম যোগালক্ষ্মী কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলেকে ক্ষমা করে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। শ্রীলঙ্কায় এ ঘটনায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক দল, সরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন আনোজানের সাজা মওকুফের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো সময়সূচি প্রকাশ করেনি। কবে সাজা কার্যকর হবে, তা-ও জানা যায়নি। সৌদি আরবে অতীতে পরিবার বা বিদেশি দূতাবাসকে আগাম না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুনের শেষ দিকে শ্রীলঙ্কায় একটি ধর্মীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। হিন্দু তীর্থযাত্রীদের নিয়ে একটি ঘটনার পর এক মুসলিম তরুণের একটি কুকুরকে লাথি দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে অনলাইনে ধর্মীয় বিতর্ক শুরু হয়।
বিতর্কের একপর্যায়ে এক ব্যক্তি হিন্দু ধর্মের একটি দেবতাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এর জবাবে আনোজান তামিল ভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন।
পরে তিনি মন্তব্যটি মুছে দিয়ে ক্ষমা চেয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। কিন্তু ওই মন্তব্যের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তা আনোজানের নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও সৌদি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। জুলাইয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের পর তার ব্যক্তিগত ডিভাইস জব্দ করা হয় এবং সৌদি কর্তৃপক্ষ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোও মুছে দেয়।
আনোজানের ভাই হামসিদান শিবারাসা বিবিসি বলেন, সৌদি আরবে কেউ প্রথমে বিষয়টি জানতেন না। শ্রীলঙ্কার কিছু ব্যক্তি তার ভাইয়ের কর্মস্থলে ই-মেইল পাঠানোর পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। পরে প্রতিষ্ঠানটি সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানালে আনোজানের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
পরে আনোজানকে প্রথমে আল-আহসা ক্রিমিনাল কোর্ট পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করে। তার সাজা কমানোর আবেদন করা হলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে জানান শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ।
এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর মামলায় বড় পরিবর্তন আসে। সৌদি প্রসিকিউশন সাইবার অপরাধ আইনের পরিবর্তে শরিয়াহ আইনে আনোজানের বিচার চেয়ে আপিল করে। আপিল আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে এবং তার সাজা মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত করে।
শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আনোজানকে সহায়তার জন্য তারা সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২১ সেপ্টেম্বর তার পরিবার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে দেখা করে। প্রেসিডেন্ট তাদের আশ্বস্ত করেন, আনোজানের জন্য সাধারণ ক্ষমা আদায়ে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
সৌদি যাচ্ছে শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিদল
আনোজানের মামলার বিষয়ে তার সৌদি আরবের আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করতে শ্রীলঙ্কার চার সদস্যের একটি আইনি প্রতিনিধিদল দেশটিতে যাচ্ছে।
প্রতিনিধি দলের সদস্য প্রেসিডেন্টস কাউন্সেল উপুল কুমারাপ্পেরুমা বলেন, সৌদি আরবে দুটি আইন প্রতিষ্ঠান আনোজানের মামলা পরিচালনা করছে। তাদের আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হবে।
এদিকে আনোজানের পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ ২৮ সেপ্টেম্বর যোগাযোগ হয়েছিল। তার ভাই জানান, এরপর থেকে তারা তার কোনো ফোন পাননি। বিষয়টি তারা দূতাবাসকে জানিয়েছেন এবং তার অবস্থার বিষয়ে তথ্য চেয়েছেন। তবে এখনো কোনো উত্তর পাননি।
সৌদি কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাধারণত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। কারাগার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করা হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সৌদি আরবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে কঠোর সাজা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। ২০২৩ সালে সৌদি নাগরিক ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আল-গামদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই সাজা বাতিল করে তাকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে ১ কোটির বেশি বিদেশি শ্রমিক রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা ও পর্যাপ্ত আইনি প্রতিনিধিত্বের অভাবে স্বল্প আয়ের অভিবাসী শ্রমিকরা দেশটির বিচারব্যবস্থায় বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়েন।