প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২৬
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের প্রবাসী শ্রমিকেরা বিচারপ্রক্রিয়ায় নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আদালতে উপযুক্ত দোভাষী না পাওয়া, আইনজীবী নিয়োগ বা আইনি সহায়তা নেওয়ার সামর্থ্য না থাকা এবং নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মতো অভিযোগও রয়েছে।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়েছে
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের ৭৫ শতাংশই বিভিন্ন দেশের প্রবাসী শ্রমিক।
মিনা রাইটস গ্রুপ, ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস, আলকস্ট ফর হিউম্যান রাইটস ও রিপ্রিভের গত মে মাসে প্রকাশিত এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সৌদি আরবে রেকর্ড ৩৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩৮ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন। বিদেশিদের মধ্যে ১২২ জন মাদক মামলার আসামি ছিলেন। এ ছাড়া চারজন নাইজেরীয় নারীসহ মোট নয়জন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৬ জনে দাঁড়ায়। তাঁদের মধ্যে ২৪০ জন মাদক মামলার আসামি এবং ১৮৮ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন।
সৌদি সরকারের দাবি, ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তারা একটি খসড়া দণ্ডবিধি তৈরি করেছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মোট জনসংখ্যার ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ বা ১ কোটি ৫৭ লাখ মানুষ বিদেশি নাগরিক। মাদকসংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ৭৫ শতাংশই বিদেশি। বিচারপ্রক্রিয়ায় দোভাষীর অভাব, আইনি সহায়তার সুযোগ না থাকা এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মতো গুরুতর বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তাঁরা।
প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষায় দূতাবাসের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের (সিএমএস) পরিচালক ড. সেলিম রেজা এ সংকট মোকাবিলায় প্রবাসী কর্মীদের সৌদি আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা দেওয়া এবং বাংলাদেশ দূতাবাসে জনবল বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, সৌদি আরব শরিয়াহ আইনে পরিচালিত হয়। কর্মীদের স্থানীয় আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান দিয়ে পাঠানো না গেলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সামনে আরও বাড়বে।
২০১৩ সালের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইং বা শ্রমকল্যাণ শাখার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা, কর্মক্ষেত্র পরিদর্শন, নিয়োগপত্র সত্যায়ন, বকেয়া বেতন আদায় এবং আইনি বিপদে পড়া প্রবাসীদের কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা দেওয়া।
তবে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের সেন্টার ফর হায়ার স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সৌদি আরবের মতো বিশাল দেশে লাখ লাখ প্রবাসীর বিপরীতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ শাখায় পর্যাপ্ত জনবল, লজিস্টিকস ও প্রয়োজনীয় আইনি তহবিলের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে সৌদি বিচারব্যবস্থায় বাংলাভাষী প্রবাসীদের পক্ষে কার্যকর আইনি লড়াই চালানো এবং তাঁদের কর্মপরিবেশ নিয়মিত পরিদর্শন করা শ্রমকল্যাণ শাখার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের উৎস
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালে রেকর্ড প্রায় সাড়ে সাত লাখ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন।
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৫৮৪ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭২ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা।
Ns Bangla edition