প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫
শৈশবেই হারিয়েছেন প্রিয় বাবা, স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। একমাত্র ভাই আরাফাত রহমান কোকোকেও হারিয়েছেন এক দশক আগে। এক-এগারো সরকারের রোষানলে পড়ে দেশত্যাগে বাধ্য হন। শুরু হয় নির্বাসন ও দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন। তার জীবনের সবচেয়ে আপনজন মমতাময়ী মা, আপসহীন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক খালেদা জিয়া। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। মায়ের সান্নিধ্য পাওয়া আর নতুন বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে দেশে ফেরার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিলেন তিনি। এরইমধ্যে মমতাময়ী মা খালেদা জিয়া হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জরুরিভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। এদিকে তার দেশের ফেরার তারিখ চূড়ান্ত হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর মাতৃভূমিতে ফিরলেন তারেক রহমান।ঐতিহাসিক এই প্রত্যাবর্তনের মাত্র ছয়দিনের মাথায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩৭ দিন চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে না ফেরার দেশের পাড়ি জমান দেশের রাজনীতির আপসহীন নক্ষত্র খালেদা জিয়া।বিএনপি ও মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের সূত্র জানায়, সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) রাতে হঠাৎই খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তার যাতে কোনো কষ্ট না হয় এ জন্য রাতে ব্যাথার ও ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়।
মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য জানান, খালেদা জিয়া ‘গভীর ঘুম’ অবস্থায় ছিলেন। যখন আমরা দেখি ব্লাড প্রেশার একদমই ধরে রাখা যাচ্ছিল না, তখন ব্লাড প্রেশারের ওষুধ দেওয়া হয় যাতে ব্লাড প্রেশারটা ধরে রাখা যায়। যেহেতু ভ্যান্টিলেশনে ছিলেন, অনেক সময় দেখা যায় অস্বস্তি হয়। যাতে কোনো অস্বস্তি না হয়, কোনো কিছু যাতে টের না পান, এ জন্য ঘুমের ওষুধ দেওয়া ছিল। এভাবেই আস্তে আস্তে চলে গেছেন …।ফ্যামিলি মেম্বাররা যথেষ্ঠ সময় পেয়েছেন— পাশে থাকা, হাত ধরা, দোয়া করা। আমরা মাঝে মাঝে এলাও করতাম। ফ্যামিলি মেম্বার যারা মানিয়ে নিতে পারতেন, তারা প্রচুর সময় দিয়েছেন।
মেডিকেল বোর্ডের একাধিক সদস্য এনটিভি অনলাইনকে জানান, ১ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার ভ্যান্টিলেশন টিউব লাগানো হয়। এরপর আর কারও সাথে কথা বলতে পারেননি। এর আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ছোট ছেলের স্ত্রী শামিলা রহমানের সঙ্গে অনেক কথা বলেছেন। ভাই শামীম ইস্কান্দারের সঙ্গে কথা-বার্তা বলতেন। খালেদা জিয়ার হেল্পিংহ্যান্ড ফাতেমার সঙ্গে কথা বলতেন। ভ্যান্টিলেশনে নেওয়ার আগ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন, সময় কাটিয়েছেন। যখন ভালো থাকতেন, তখন টেকনিশিয়ান যারা আছেন তাদের সঙ্গে চিকিৎসার বাইরেও পরিবারের খোঁজ নিতেন।এ প্রসঙ্গে মেডিক্যাল বোর্ডের একজন চিকিৎসক বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) সঙ্গে আমরা একটা ফ্যামিলি বন্ডিংয়ে ছিলাম। ম্যাডাম জিজ্ঞেস করতেন— বাসার সবাই কেমন আছে, কার ছেলে কেমন আছে, বাচ্চা কেমন আছে। এই লেভেলের কমিউনিকেশন ছিল। শরীর ভালো থাকলে এমনভাবে কথা-বার্তা বলতেন। অনেকটা পারিবারিক আবহে। আমরা তো প্রায় ৫ বছর ধরে ম্যাডামের চিকিৎসায় সংযুক্ত ছিলাম। প্রফেশনের বাইরে গিয়েও আমরা একটা পরিবারের মতো হয়ে গিয়েছিলাম।মেডিকেল বোর্ডের আরেক চিকিৎসক জানান, তারেক রহমান সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সারাদিন নয়াপল্টনে নেতাকর্মীদের সাথে কুশল বিনিময় শেষে সন্ধ্যার পর হাসপাতালে আসেন। যতক্ষণ ছিলেন মায়ের পাশেই বসেছিলেন। রাত ২টার দিকে তারেক রহমান বাসায় চলে যান। তখন মনে হয়েছিল, রাতটা ম্যাডাম সারভাইভ করবেন। চেয়ারম্যান সাহেব (তারেক রহমান) বাসায় রেস্ট নিয়ে সকালে আসবেন, তখন দেখা যাবে। কিন্তু তিনি বাসায় গিয়ে রেস্টও নিতে পারেননি, সঙ্গে সঙ্গে আমরা কল করলাম। আর উনি চলে আসলেন। পুরোটা সময় তিনি মাড্যামের পায়ের কাছে, পেটের পাশে বসেছিলেন।খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের সদস্য আইসিইউ কনসালট্যান্ট ডা. জাফর ইকবাল জানান, বিএনপি চেয়ারপারসনের ডায়ালায়সিস বন্ধ হলেই শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি হয়। স্বাস্থ্যের অনেক জটিলতা থাকায় বয়সের কারণে একসঙ্গে সব চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছিল না।
তিনি বলেন, সোমবার রাতে ম্যাডামের ব্লাড প্রেশার ওঠা-নামা করতে থাকে। উনি (তারেক রহমান) সব বুঝতে পারছিলেন, মনিটরের দিকে তাকাচ্ছিলেন— কখন ব্লাড পেসার ফল করছে, কখন হার্টবিট ফল করছে। উনি সব মনিটরে দেখছিলেন। মনিটর দেখেই বোঝা যাচ্ছিল রোগীর অবস্থা। ডাক্তারদের মুভমেন্ট দেখেই উনি (তারেক রহমান) মেসেজ পেয়ে যাচ্ছিলেন। মুখে বলতে হয়নি যে আপনার আম্মার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
Ns/coll