বাংলাদেশে আইপিএলসহ সকল ভারতীয় পণ্য ও চ্যানেল বয়কটের ডাক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৪, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশে আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে বিসিসিআই-এর এমন সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে দেখছেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। এর প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইপিএল ও ভারতীয় সকল পণ্য ও চ্যানেল বয়কটের ডাক দিয়েছেন দেশপ্রেমিক জনতা। অন্যদিকে, কড়া আইনি ও কূটনৈতিক জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিসিবি।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাতে বিসিবি কার্যালয়ে এক জরুরি বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে জানা গেছে, মুস্তাফিজকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে এবং আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) আনুষ্ঠানিক চিঠি দিচ্ছে বিসিবি। বিশেষ করে সিকিউরিটি ইউনিটের কাছে ক্রিকেটার, কর্মকর্তা এবং দর্শকদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি চাওয়া হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে নিজের ফেসবুক পেজে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। গোলামীর দিন শেষ!” তিনি বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছেন। এছাড়া আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইসিসিকে চাপ দিতে বিসিবিকে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

বিসিবির সাবেক পরিচালক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক বলেন, যেখানে একজন মুস্তাফিজের নিরাপত্তা নেই, সেখানে পুরো দলের ভারত সফর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল সংসদ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতীয় সকল খেলা সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। হল সংসদের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, ক্রিকেটের ন্যায্যতা ও পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে মুস্তাফিজের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ভারতের লোকসভার সদস্য ও কংগ্রেস নেতা শশী থারুরও বিসিসিআইয়ের সমালোচনা করে প্রশ্ন তুলেছেন—এটি কি কোনো ব্যক্তি বা তার ধর্মের ওপর শাস্তি কি না। এমনকি ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় ক্রিকেটার মদন লাল এই ঘটনায় রাজনীতি টেনে আনার তীব্র সমালোচনা করে বিসিসিআইয়ের একতরফা সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারত বয়কটের ডাক
মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে #BoycottIPL এবং #JusticeForMustafiz হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষ তিনটি প্রধান দাবি তুলছেন: বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা, ভারতীয় সকল ক্রীড়া সামগ্রী ও পণ্য বর্জন এবং সম্মান রক্ষা না হলে ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জন করা।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের অনুপযুক্ত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। শনিবার (৩ জানুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ ভারতকে ‘উগ্র রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি লেখেন,‘এরকম একটা উগ্র রাষ্ট্রকে কোনোপ্রকার আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজনের সুযোগ দেয়া উচিত নয়। সরকার এবং বিসিবির যৌথ উদ্যোগে অন্যান্য ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ভারতকে আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজনের অনুপযুক্ত ঘোষণা করা উচিত।’

দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদা রক্ষায় ফেসবুকে আইপিএল বয়কটের ডাক দিয়ে আলাউদ্দিন সৌরভ লিখেছেন, ‘‘ব্যক্তি মুস্তাফিজের চেয়ে আমাদের জাতীয় মর্যাদা অনেক বড়! যাদের দেশে আমাদের একজন সেরা ক্রিকেটারের নিরাপত্তা নেই, যারা উগ্র সাম্প্রদায়িক হুমকির মুখে নতি স্বীকার করে একজন পেশাদার খেলোয়াড়কে বাদ দেয়—সেই আইপিএল আমাদের দেখার প্রয়োজন নেই। ক্রিকেট বিনোদনের চেয়ে দেশের সম্মান আগে।আজ থেকে আইপিএল বয়কট করলাম। কোনো খেলা দেখব না, স্কোর দেখব না। দালালি বন্ধ হোক, আত্মসম্মান জেগে উঠুক।’’
কামরুজ্জামান শামিম লিখেছেন, ‘‘চরম অবমাননার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার সময় এসেছে! বিসিসিআই প্রমাণ করেছে তারা ক্রিকেট নয়, আধিপত্যের রাজনীতি করে। মুস্তাফিজকে বাদ দিয়ে তারা শুধু তাকে নয়, পুরো বাংলাদেশকে অপমান করেছে। আমাদের দাবি পরিষ্কার: বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। যে চ্যানেল খেলা দেখাবে বা যে কোম্পানি স্পন্সর করবে, তাদেরও বয়কট করা হবে। যেখানে নিরাপত্তা নেই, সেখানে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আসুন প্রমাণ করি—বাংলাদেশ মাথা নোয়াতে জানে না।ইঞ্জিনিয়ার আকাশ লিখেছেন, ‘‘একজন মুস্তাফিজের নিরাপত্তা দিতে যারা ব্যর্থ, তারা পুরো বাংলাদেশ টিমকে বিশ্বকাপ খেলার নিরাপত্তা দেবে কীভাবে? আইপিএল এখন আর খেলা নেই, এটা উগ্র রাজনীতির আখড়া হয়ে গেছে। মুস্তাফিজকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত এই টুর্নামেন্ট বর্জন করা। টিভি বা ইউটিউব—কোথাও আইপিএল দেখব না।দেশের সম্মানে এক হোন। বয়কট আইপিএল!

বর্তমানে বিসিবি এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। বাংলাদেশের ক্রিকেটের মর্যাদা রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা।

উল্লেখ্য, ২০২৬ আইপিএল নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ টাকায় কেকেআর মুস্তাফিজকে দলে নিলেও সম্প্রতি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর আন্দোলনের মুখে তাকে স্কোয়াড থেকে মুক্ত করার নির্দেশ দেয় বিসিসিআই। বিজেপির একাধিক নেতা ও ধর্মীয় গুরুরা এই সিদ্ধান্তকে ‘হিন্দুদের জয়’ বলে অভিহিত করায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

  • শেয়ার করুন