বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ জামায়াতের কৃষ্ণ নন্দী

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

আসছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুলনা-১ আসন নিয়ে আলোচনার যেন শেষ নেই। দাকোপ-বটিয়াঘাটা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে হিন্দু ভোটার প্রায় ৪৩ শতাংশ। তাদের ভোট টানতে মরিয়া সব দলই। মোট ১২ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮ জনই হিন্দু ধর্মাবলম্বী এই আসনে। এতদিন বিএনপি, আওয়ামী লীগের হিন্দু প্রার্থী থাকলেও এবার জামায়াতে ইসলামী হিন্দু প্রার্থী দিয়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। তবে জোটের মাঠের চেয়ে ভোটের মাঠের হিসাব ভিন্ন বলছেন ভোটাররা।

এই নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেই, ফলে এলাকায় নেই তাদের দাপট। আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপির আমীর এজাজকে ঠেকাতে আঁটঘাঁট বেঁধে নেমেছেন জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী।ভোটার-সমর্থকরা যা বলছেন
খুলনা-১ আসনের ভোটার গোবিন্দ সরকার। বটিয়াঘাটার এই ভোটারের কাছে কৃষ্ণ নন্দীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পরে এখানকার হিন্দুদের কোনো সমস্যা হয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে সবাই বাস করছেন। আর হিন্দু ভোটাররা এখন অনেক সচেতন। তারা বুঝে-শুনেই সিল মারবেন এবার।কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলার মধ্যে জামায়াতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন আবু ইউসুফ। তাকে যদি জামায়াত মনোনয়ন দিতো তাহলে কৃষ্ণ নন্দীর চেয়ে বেশি ভোট পেতো।৩০০ আসনের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা ও দাকোপ উপজেলা) আসন। জামায়াতে ইসলামী প্রথা ভেঙে ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সাবেক সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে এখানে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয়।

আসনটির বিভিন্ন গ্রাম, মহল্লা এবং প্রত্যন্ত এলাকার অন্তত ৩০ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে কৃষ্ণ নন্দীর যে জনপ্রিয়তার কথা শোনা যায় বাস্তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন।ভোটাররা বলছেন, ধর্মীয় পরিচয়ে নয় যে ৫ আগস্টের পর সুখে-দুঃখে পাশে ছিলেন, হিন্দুদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন মূলত তাকেই ভোট দেবেন তারা।প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আরও যারা আছেন
খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খান। আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকাটিতে বিএনপির প্রার্থীকে এগিয়ে রাখছেন অনেকেই। এছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন স্বতন্ত্র প্রার্থী অচিন্ত্য কুমার মণ্ডল, কমিউনিস্ট পার্টির কিশোর কুমার রায়, স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ হালদার, গণঅধিকার পরিষদের জি.এম. রোকনুজ্জামান, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির প্রবীর গোপাল রায়, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সুনীল শুভ রায়, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রসেনজিৎ দত্ত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু সাঈদ, জাতীয় পার্টির মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টির সুব্রত মণ্ডল।

বিএনপি এ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ভোট পাননি কখনো। এ বাস্তবতায় জামায়াতের কৃষ্ণ নন্দী ভোটের লড়াইয়ে কতটা দাঁড়াতে পারবেন তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে জোর আলোচনা।কঠিন সমীকরণে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক
পুরো এলাকা ঘুরে জানা গেলো, কৃষ্ণ নন্দীর রাজনৈতিক যাত্রা নিয়ে বিতর্কও কম নয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের অতি ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় কৃষ্ণ নন্দী কীভাবে জনপ্রিয় স্থানীয় জামায়াত নেতা শেখ আবু ইউসুফকে হটিয়ে জামায়াতের মনোনয়ন বাগিয়েছেন তা নিয়ে অনেকেই বেশ দ্বিধান্বিত।স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কৃষ্ণ নন্দী ছিলেন সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ঘনিষ্ঠজন।বালিয়াঘাটা এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হিন্দু ভোটার বলেন, স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিকে আমরা কীভাবে ভোট দিতে পারি? যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করলো, সেই মার্কায় ভোট আমরা দেবো না। প্রয়োজনে কেন্দ্রে গিয়ে ব্যালটে সিল মারবো না, তবু দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়া সম্ভব না।

৮০-র বেশি বয়সী আরেকজন বলেন, ‘এই বয়সে এসেও দেখতি হবি হিন্দু লোক জামায়াতের ভোট করে কেমনে। হিন্দুদের কী সম্মান নাই যে জামায়াতে ভোট দিতি হবি।’ভোটের হিসাবে খুলনা-১
দাকোপ উপজেলায় ৫৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং বটিয়াঘাটায় ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাসিন্দা হিন্দু। সবমিলিয়ে এ আসনের প্রায় ৪৩ শতাংশ ভোটারই হিন্দু সম্প্রদায়ের। খ্রিষ্টানরাও আছেন ২ শতাংশের বেশি। স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে সংখ্যালঘু প্রার্থীরাই অধিকাংশবার নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে কুবের চন্দ্র বিশ্বাস, পরেরবার প্রফুল্ল কুমার শীল জয়ী হন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা জয়ী হলেও আসন ছাড়ার পর উপ-নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরূপে পঞ্চানন বিশ্বাস জয় পান। পরবর্তীতে ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ননী গোপাল মণ্ডল ও পঞ্চানন বিশ্বাস পর্যায়ক্রমে জিতেছেন। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে পুনরায় ননী গোপাল মণ্ডল বিজয়ী হন। রাজনৈতিকভাবে এ আসন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত।খুলনা-১ আসনের মধ্যে দাকোপে ৯টি ও বটিয়াঘাটায় ৭টি ইউনিয়ন রয়েছে। এই দুই উপজেলায় মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ১০৩। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫২ হাজার ২৮৫ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮১৪। এ আসনেও নারী ভোটার বেশি। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন চারজন।
ns coll / ns jn

  • শেয়ার করুন