প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬
বাংলাদেশের সবুজ জার্সি গায়ে চাপানোর স্বপ্ন ছিল তার। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের ধাপগুলো টপকে ছিলেন খুলনা জেলা অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অধিনায়কও। তবে হুট করেই জীবনের মাঠে আসে সবচেয়ে কঠিন বাউন্সার—বাবার মৃত্যু। মুহূর্তেই বদলে যায় জীবনের সব হিসেব-নিকাশ। ব্যাট-বল সাময়িকভাবে তুলে রেখে পরিবারের হাল ধরতে কারখানার শ্রমিক হিসেবে পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। সেই চরম প্রতিকূলতা পেরিয়ে যিনি আজ জায়গা করে নিয়েছেন মালয়েশিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলে।
তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার নাজমুস সাকিব। এবার কোনো সাধারণ প্রবাসী বা কারখানার শ্রমিক হিসেবে নয়, মালয়েশিয়া জাতীয় দলের প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের বিপক্ষে সিরিজ খেলতে নিজ জন্মভূমিতে এসেছেন সাকিব। সম্প্রতি জাগো নিউজ-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় ভাগ্যের নির্মম মোড় পেরিয়ে আজকের জায়গায় পৌঁছানোর সংগ্রাম ও রোমাঞ্চকর গল্প শুনিয়েছেন এই তরুণ ক্রিকেটার।
বাবাকে হারিয়ে কারখানার শ্রমিক, রাতে মোজায় বল পুরে অনুশীলন
২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর ওয়ার্কিং ভিসায় মালয়েশিয়া পাড়ি দেন সাকিব। সেখানে এক বেডশিট তৈরির কারখানায় দিনে ৪-৫টি কনটেইনার নামানোর কাজ করতেন তিনি, যার একেকটি কার্টনের ওজন ছিল ৪০ থেকে ৫০ কেজি।
সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ক্রিকেটের অদম্য নেশা ছাড়তে পারেননি সাকিব। সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন,’সারাদিন ভারী কাজ শেষে রাতে চরম ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ত। কিন্তু ক্রিকেটটা যে আমার রক্তে মিশে ছিল। রাতে রুমে ফিরে মোজার ভেতর বল ঢুকিয়ে একা একা নকিং করতাম, যাতে অন্তত চোখের সাথে বলের টাইমিং আর ‘আই কন্টাক্ট’ ঠিক থাকে। আমার ভেতরে একটা জেদ ছিল—আমি পারব।’
টেপ টেনিস থেকে জাতীয় দলে উত্থান
কাজের পাশাপাশি ছুটির দিনে টানা তিন বছর টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলতেন সাকিব। এমনই একদিন স্থানীয় এক ক্লাব কর্মকর্তার নজরে পড়েন তিনি। ক্লাব কর্মকর্তা তাকে প্রথম বিভাগ টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ করে দেন। অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুযোগ না পেলেও প্রথম ম্যাচেই ৫০ বলে ১০০ রান করে সবাইকে চমকে দেন সাকিব।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ইন্টার-স্টেট টুর্নামেন্টে প্রথম বছর তৃতীয় ও পরের বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। সেখান থেকেই তার ডাক পড়ে মালয়েশিয়া-এ দলে। ইতালির বিপক্ষে অভিষেক ও পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে ৫০ বলে ১২২ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলে অবশেষে তিনি জায়গা করে নেন মালয়েশিয়া মূল জাতীয় দলে।
বিদেশের মাটিতে প্রবাসী ও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করার লক্ষ্য
মালয়েশিয়ায় ক্রিকেট বোর্ডের অফার পেয়ে প্রথমে ইতস্তত বোধ করলেও বড় ভাই আজিজ শেখের মানসিক সমর্থনে সাহসের সাথে মাঠে নামেন সাকিব। ভাই নিজে ক্রিকেটার হতে না পারায় তার স্বপ্ন পূরণের জেদও কাজ করেছিল সাকিবের মনে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ে ২৫ নম্বর স্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া। সাকিব জানান, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য র্যাংকিংয়ের সেরা ২০-এ আসা এবং আগামী বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা। একইসঙ্গে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির বার্তা দিতে চান সাকিব। তিনি বলেন,’বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশকে আরও গর্বিত করতে চাই। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় প্রবাসীরা যেন মাথা উঁচু করে বলতে পারেন—আমাদের বাঙালি একটি ছেলে এই দেশের হয়ে খেলছে।’
শৈশবের ক্রিকেট শিক্ষা ও আদর্শ
খুলনার ছেলে সাকিবের ক্রিকেটে আসার গল্পটাও বেশ রোমাঞ্চকর। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় স্কুল শিক্ষকের কাছে এক বান্ধবীর সুপারিশে প্রথম ক্রিকেট দলে নাম লেখান সাকিব। পরবর্তীতে খুলনা ক্রিকেট একাডেমির পরিচালক ও কোচ জুয়েল স্যারের পরম স্নেহ ও বিনামূল্যে দেওয়া সব ক্রিকেট উপকরণের মাধ্যমে গড়ে ওঠেন তিনি। সাকিব বলেন,’আম্মু একবার কানের দুল বিক্রি করে আমাকে ব্যাট কিনে দিয়েছিলেন। আর আমার কোচ জুয়েল স্যার আমাকে নিজের ছেলের মতো ভালোবেসে সবসময় সাহায্য করেছেন।’
উইকেটকিপার-ব্যাটার হওয়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে নুরুল হাসান সোহান ও তামিম ইকবালকে পছন্দের তালিকায় রেখেছেন সাকিব। এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতীয় তারকা শুভমান গিলকে অনুসরণ করলেও জীবন যুদ্ধে তার বড় ভাইকেই প্রধান আইডল মনে করেন তিনি।
সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসা নিয়ে সাকিব জানান, দেশের স্পিনারদের বিপক্ষে খেলে নিজের ক্রিকেটীয় স্কিল বাড়াতেই যখনই সুযোগ পান, জন্মভূমিতে ফিরে ম্যাচ খেলেন তিনি।
ns coll