প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৬
সাধারণ পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা কলিতা মাঝির গল্পটা শুধু একটি নির্বাচনী জয়ের গল্প নয়, বরং নিজের সীমানার বাইরে গিয়ে সাফল্যের এক উদাহরণ তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রাম কেন্দ্র থেকে উঠে আসা কলিতা মাঝি মাসে মাত্র ২,৫০০ টাকা আয় করতেন। তিনি ছিলেন একজন গৃহকর্মী। আর দীর্ঘ সংগ্রামের পর আজ তিনি বিধায়ক (এমএলএ) হিসেবে মানুষের ভালোবাসায় নির্বাচিত হয়েছেন। এই পথটা তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না।
ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম
কলিতা মাঝি বড় হয়েছেন চরম আর্থিক অভাবের মধ্যে। তার বাবা ছিলেন দিনমজুর, আর বড় পরিবারে সাত বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে বড় হতে গিয়ে খুব ছোট বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। টাকার অভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। সংসারের দায় কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়ে একাধিক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন।
বিয়ের পরও থামেনি সংগ্রাম
বিয়ের পরও সংগ্রাম থামেনি। তার স্বামী সুব্রত মাঝি একজন দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার চালানো, সন্তানের পড়াশোনা—সব কিছু সামলাতে হয়েছে তাকে। তাদের ছেলে পার্থ বর্তমানে স্কুলে পড়ে। ভোর ৫টায় উঠে কাজ শুরু করা ছিল তার প্রতিদিনের রুটিন। অনেক সময় দুই-তিনটি বাড়িতে কাজ করে মাসে ২,৫০০ থেকে ৪,৫০০ টাকার মতো আয় করতেন তিনি।
রাজনীতিতে প্রবেশ
এই কঠিন জীবনই তাকে মানুষের সমস্যা বুঝতে সাহায্য করে। প্রায় এক দশক আগে তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। শুরুটা ছিল একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে—বুথ কর্মী হিসেবে। ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, এলাকায় পরিচিতি এবং সক্রিয়তা জনগণের সামনে তুলে ধরে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রথমবার প্রার্থী হন। যদিও সে সময় তিনি হেরে যান, তবুও প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট পান—যা তার জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। সেই হার তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং আরও শক্ত করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।
পরিবর্তনের বছর
২০২৬ সালে আবারও তাকে প্রার্থী করা হয়। এবার তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত। তার নির্বাচনী প্রচার ছিল খুবই সাধারণ, কিন্তু কার্যকর। কোনো বড় অর্থবল, প্রচারযন্ত্র বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার ছিল না তার পাশে। ছিল শুধু মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা বিশ্বাস আর ভরসার সম্পর্ক।
তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করেছেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন, তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন। যে সমস্যাগুলো তিনি নিজে জীবনে অনুভব করেছেন—সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
গৃহকর্মী থেকে জনপ্রতিনিধি
নির্বাচনের আগে তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়। প্রথমে তাকে ভোট দিতে অনেকে অস্বীকৃতি জানালেও, শহুরে সমাজে কিছু বিরক্তি দেখা গেলেও, পরে এটি নতুন অর্থ পায়। এটি হয়ে ওঠে গণতন্ত্রে প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণের প্রতীক।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মুখ হয়ে ওঠেন কলিতা মাঝি। যাকে একসময় “গৃহকর্মী” পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল, তিনিই আজ জনগণের প্রতিনিধিরূপে জনগণের ভোটে জয়ী হয়েছে।
অভাবনীয় জয়
অবশেষে নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, তিনি ১ লক্ষেরও বেশি ভোট পেয়ে প্রায় ১২,৫০০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেন। এই জয় শুধু ব্যক্তিগত নয়— এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেও শক্তিশালী নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে।
তার হলফনামা অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ খুবই কম— প্রায় ১.৬ লক্ষ টাকা। তার স্বামীর একটি ছোট বাড়ি রয়েছে, যার মূল্যও খুব বেশি নয়। এত সীমিত সম্পদ নিয়েও তিনি আজ একটি বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব পেয়েছেন।পরিবার ও মানুষের সমর্থন
এই যাত্রায় তার পরিবার বড় ভূমিকা রেখেছে। তার ছেলে পার্থ প্রচারে সাহায্য করেছে, আর শাশুড়ি সংসারের দায়িত্ব সামলেছেন। এমনকি যেসব বাড়িতে তিনি কাজ করতেন, তারাও তাচর পাশে দাঁড়িয়েছেন— কাজ না করলেও বেতন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
পরিবর্তনের প্রতীক
কলিতা মাঝির জয় একটি বড় বার্তা মানুষের সামনে তুলে ধরে। একটা মিথ ছিল রাজনীতি শুধু ধনী বা প্রভাবশালীদের জন্য, তার জয়ে এটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কঠোর পরিশ্রম— এই গুণগুলোই একজন নেতাকে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আর এরই প্রতিফলন তার মধ্যে উঠে এসেছে।
একইভাবে, চন্দনা বাউরির মতো আরও কিছু প্রার্থীও সামনে এসেছেন, যারা প্রমাণ করেছেন যে সমাজের প্রান্তিক স্তর থেকেও নেতৃত্ব উঠে আসা সম্ভব।
কলিতা মাঝির গল্প আমাদের শেখায়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা উচিত নয়। সুযোগ পেলে এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখলে যে কোনো যোগ্য ব্যক্তি একজন এমএলএ হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে পারেন, নিজের অবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্যের প্রয়োজন নিয়েও কাজ করতে পারেন।
তাই তিনি এখন শুধু একজন জনপ্রতিনিধি নন, তিনি সংগ্রাম, সাহস আর পরিবর্তনের এক জীবন্ত প্রতীক।
ns coll