পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জেতা অর্ধেক আসনেই জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি

প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গে যে ১০৫টি আসনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জিতেছে, সেখানে বিতর্কিত ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাস (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি। এই ১০৫টি আসনের মধ্যে ৮৬টিতেই বিজেপি আগে কখনও জেতেনি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের স্ক্রলের এক তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।গত সোমবার (৪ মে) ঘোষিত নির্বাচনি ফল অনুযায়ী, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে মোট ২০৭টি আসন পেয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই এসেছে এই ১০৫টি আসন থেকে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মোট আসন ২৯৪টি। এই জয়ের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী দলটি ঐতিহাসিক দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়।

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত এবং এটি ছয় মাস ধরে চলে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে, ফলে রাজ্যের মোট ভোটার তালিকা প্রায় ১২ শতাংশ কমে যায়।

এই ৯১ লাখ বাদ পড়া ভোটারের মধ্যে অন্তত ২৭ লাখের মামলা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। পশ্চিমবঙ্গে এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন করা একমাত্র বড় রাজনৈতিক দল ছিল বিজেপি।

নির্বাচনের ফলাফল থেকে এটা স্পষ্ট যে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যে প্রবল জনঅসন্তোষ ছিল। এর ফলে আগের নির্বাচনে ২১৫টি আসন পাওয়া তৃণমূল কংগ্রেস এবার নেমে এসেছে মাত্র ৮০টি আসনে। তবে স্ক্রলের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, বিশেষ ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাস বা এসআইআরও তাদের পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ১০৫টি আসনে বিজেপি যে ব্যবধানে জিতেছে, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটারের নাম নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। এই বিশ্লেষণ করা হয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে। আর এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করেছে কলকাতাভিত্তিক জননীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সাবার ইনস্টিটিউট’।

এর একটি উদাহরণ হলো বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস আসন। ২০২১ সালেও এখানে বিজেপি জিতেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল এই আসনে বিজেপির চেয়ে ৯ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। এরপর এসআইআর প্রক্রিয়ায় এই আসনের ভোটার তালিকা থেকে মোট ৭ হাজার ৫১৫ জনের নাম বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত সোমবারের নির্বাচনে বিজেপি মাত্র ৯০০ ভোটের ব্যবধানে আবারও আসনটি জেতে।

এই ১০৫টি আসনের বেশিরভাগই এমন, যেখানে বিজেপি আগে কখনও জেতেনি। এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের দখলে থাকা ১২৯টি আসন বিজেপির কাছে হারিয়েছে। অন্যদিকে বিজেপি পাঁচ বছর আগে জেতা প্রতিটি আসনই ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এই বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য, যেসব আসন তৃণমূল থেকে বিজেপির দখলে গেছে, সেগুলোকে ‘সুইং সিট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্ক্রলের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এমন ৮৬টি সুইং আসনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম।এক্ষেত্রে দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর বিধানসভা আসনকে উদাহরণ হিসেবে নেয়া হয়েছে। বহু দশক ধরে এই আসনটি কমিউনিস্টদের দখলে ছিল। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৯৮৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এখানকার বিধায়ক ছিলেন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও এই আসনটি তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআই(এম)-এর মধ্যে হাতবদল হতে থাকে।

২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এই আসনে জয় পায় এবং সিপিআই(এম) দ্বিতীয় হয়। বিজেপি প্রার্থী তখন ৫৩ হাজার ১৩৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল। গত মাসে যাদবপুরে সরেজমিনে গিয়ে স্ক্রল দেখতে পায়, এবারও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৃণমূল ও সিপিআই(এম)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাদবপুর আসনের ভোটার তালিকা থেকে মোট ৫৬ হাজারের বেশি নাম বাদ দেয়া হয়। এবারের নির্বাচনে বিজেপি প্রথমবারের মতো এই আসন জেতে, আর তাদের জয়ের ব্যবধান ছিল এর অর্ধেকেরও কম, মাত্র ২৭ হাজার ৭১৬ ভোট।

যাদবপুরে বিজেপির মোট ভোট বেড়ে ১ লাখ ৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে তৃণমূলের বর্তমান বিধায়ক আগেরবারের তুলনায় প্রায় ২০ হাজার কম ভোট পান। সিপিআই(এম) পেয়েছে ৪১ হাজারের কিছু বেশি ভোট।

তৃণমূলের ঘাঁটিতেও ধস

এবারের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের অনেক শক্ত ঘাঁটিও ভেঙে পড়েছে। দলের বেশ কয়েকজন পরিচিত নেতা এমনসব আসনে হেরে যান, যেগুলোকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তৃণমূলের নিশ্চিত ঘাঁটি বলে মনে করতেন।

বিদায়ী সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো টালিগঞ্জ আসনে হেরে যান। বিজেপি প্রার্থী সেখানে ৬ হাজার ১৩ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। অথচ এসআইআর প্রক্রিয়ায় ওই আসনের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল ৩৭ হাজার ৮৮৯ জনের নাম।

এছাড়া আরও অন্তত ১০ জন মন্ত্রী একই পরিণতির মুখে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন শশী পাঞ্জা, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, মলয় ঘটক এবং স্নেহাশীষ চক্রবর্তী। তাদের প্রত্যেকের আসনেই এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি।সবচেয়ে বড় ধাক্কা পান তৃণমূল নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। তিনি ভবানীপুর আসনে বিজেপির প্রভাবশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে হেরে যান। ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের দখলে থাকা এই আসনে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৫১ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ দেয়া হয়েছিল।
ns coll

  • শেয়ার করুন