প্রকাশিত: জানুয়ারি ৮, ২০২৬
২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শাসনামলে রাশিয়া একটি গোপন বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, যেখানে ইউক্রেনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার শর্তে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারে রাজি ছিল ক্রেমলিন।
ট্রাম্পের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ফিওনা হিলের দেওয়া এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সম্প্রতি মাদুরোকে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হাতে আটকের ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিল জানান, সে সময় রুশ কর্মকর্তারা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি রাশিয়াকে ইউরোপে বা ইউক্রেনে তাদের ইচ্ছামতো কাজ করার সুযোগ দেয়, তবে রাশিয়াও পশ্চিম গোলার্ধে বা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পদক্ষেপ মেনে নেবে।
ফিওনা হিল ২০১৯ সালে মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে বলেছিলেন, রুশরা মূলত ১৯ শতকের ‘মনরো ডকট্রিন’ বা মনরো নীতির আদলে এই বিনিময়ের ধারণাটি প্রচার করেছিল। এই নীতি অনুযায়ী, পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ট্রাম্প বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের ন্যায্যতা দিতে এই নীতিটিই ব্যবহার করছেন। হিল জানান, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন রুশ রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আন্তোনোভ তাঁকে বহুবার এই ধরণের ‘ইশারা-ইঙ্গিত ও গোপন প্রস্তাব’ দিলেও সে সময় হোয়াইট হাউস তাতে সাড়া দেয়নি এবং ইউক্রেন ও ভেনেজুয়েলাকে দুটি ভিন্ন ইস্যু হিসেবে গণ্য করেছিল।
সাত বছর পর বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপগুলো রাশিয়ার সেই পুরনো ‘প্রভাববলয়’ তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন ভেনেজুয়েলার শাসনভার ও তেল সম্পদ ‘পরিচালনা’ করার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে।
ফিওনা হিল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে এখন ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আগ্রাসনকে ‘অবৈধ’ বলে নিন্দা জানানো পশ্চিমা মিত্রদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন প্রায় একই ধরণের অজুহাতে একটি স্বাধীন দেশের সরকার হটিয়ে দিয়েছে, যা রাশিয়ার ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিকেই প্রকারান্তরে বৈধতা দিচ্ছে।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার এই অভিযানকে স্রেফ একটি ‘আইন প্রয়োগকারী অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করলেও আন্তর্জাতিক মহলে একে সামরিক আগ্রাসন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো পরাশক্তিগুলো পুনরায় নিজেদের নির্দিষ্ট ‘প্রভাববলয়’ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন ফিওনা হিল।
মাদুরোর পতনের পর ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখল বা কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থার হুমকির ফলে বিশ্বরাজনীতিতে এক অস্থির ও বিপজ্জনক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। হিলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আচরণ ক্রেমলিনকে এই বার্তা দিচ্ছে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এখন থেকে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই ছোট রাষ্ট্রগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারবে।
সূত্র: এপি